বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেটের প্রবেশ

0
62

মোস্তাফিজুল আবেদীন

২০১৫ সালের নভেম্বরে ইসলামিক স্টেট ঘোষণা দেয় তারা বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় নেতার নাম প্রকাশ করতে যাচ্ছে যে ইসলামিক স্টেটের বাংলাদেশ অংশের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং দেশটিতে ইসলামিক স্টেটের স্বরূপ তুলে ধরতে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করবে। ইসলামিক স্টেট দাবী করে চলতি বছরে তারা হামলার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করবে। তারই ধারাবাহিকতায় ইসলামিক স্টেট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে খুন করে। খুনের তালিকায় একে একে যোগ হতে থাকে নিখিল জোয়ারদার নামের একজন হিন্দু দর্জি, খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হোসেন আলি নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা, আব্দুল রাজ্জাক, ছমির উদ্দিন মন্ডল, সানোয়ার হোসাইন নামের একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক এবং যোজ্ঞেশ্বর অধিকারী নামের একজন হিন্দু পুরোহিত।

এমনকি বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনী নিশ্চিত নয় আসলেই ইসলামিক স্টেটের বাংলাদেশে স্থানীয় জঙ্গীদলের সাথে আদৌ কোন সরাসরি নির্দেশনা আছে কীনা বা তাদের ইসলামিক স্টেটের নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তারা পরিচালিত হয় কীনা। এমনকি ঢাকা এবং রাকার মাঝে যোগাযোগের ধরণ কেমন সেটাও পরিষ্কার নয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, স্থানীয় জিহাদি জঙ্গীদল হামলাগুলো পরিচালনা করেছে এবং নিজেদেরকে ইসলামিক স্টেট পরিচয় দেয়ার জন্য আগ্রাসীভাবে হামলা করেছে।

ইসলামিক স্টেটের গণমাধ্যম বিভাগ বাংলাদেশে তাদের প্রচারণার জন্য সব ধরণের পন্থা অবলম্বন করে। তাদের ম্যাগাজিন ‘দাবিক’ এর এক সংখ্যায় প্রকাশিত হয় “বাংলাদেশের মুসলিম জনতা আবু বকর আল-বাগদাদির খেলাফতকে সমর্থন করে এবং বাংলাদেশে খলিফার সৈনিকদের একত্রিত করতে তাদের মাঝে পদ বন্টন হয়েছে। তাদেরকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করতে হবে”। ইসলামিক স্টেটের গণমাধ্যম বিভাগ জিহাদি কার্যক্রম, জিহাদি ভাষণ বাংলা ভাষায় প্রচার করার জোর দাবী জানায়।

ইসলামিক স্টেটের সাম্প্রতিক সংখ্যায় দাবী করা হয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক ইসলামিক স্টেটের পক্ষে সিরিয়া এবং ইরাকে যুদ্ধ করছে এবং বাংলাদেশে ক্রমেই বাড়ছে তাদের উপস্থিতি। বাংলাদেশে তারা নিজেদেরকে খেলাফতের সৈনিক হিসেবে পরিচয় দেয়। বাংলাদেশের আরও জিহাদিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে দাবিকের এপ্রিল সংখ্যায় বাংলাদেশের আইএস যোদ্ধা আবু জান্দাল আল বাঙ্গালী ওরফে আশেকুর রহমান সিরিয়ার রাকাতে কাফেরদের সাথে যুদ্ধে শহীদ হওয়ায় তার জন্য শোকগাঁথা ছাপায়।

মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া সুন্নি মুসলিম বিভাজন কাজে লাগিয়ে নৈরাজ্য এবং সন্ত্রাস কায়েমের মধ্য দিয়ে উত্তেজনা বাড়ানো ইসলামিক স্টেটের রণনীতি। ঠিক একইভাবে আবু হানিফ ঘোষণা দেয় ইসলামিক স্টেটের বাংলাদেশ শাখার মাধ্যমে বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু সংখ্যালঘু জনগণকে লক্ষ্য করে আক্রমণ পরিচালনা করবে। কারণ হিসেবে আবু হানিফ বলছে, হিন্দুরা বাংলাদেশের প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ে অবস্থান করে আছে এবং ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। হিন্দুদের লক্ষ্য করে যদি গণহারে হত্যা না করা যায় তাহলে বাংলাদেশে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে গুড়ে বালি। সেজন্য এই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে মুমিন এবং নাস্তিক বিভাজন করতে হবে এবং ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী এবং বিধর্মী নাস্তিকদের মাঝে মেরুকরণ করতে পারলে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করা অনেক সহজ। মে মাসের শুরুতে সিঙ্গাপুরে ৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার হলে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে যায়। পুলিশি তদন্তে জানা যায় আটককৃত বাংলাদেশি নাগরিকরা সিঙ্গাপুরে বসে ইসলামিক স্টেট বাংলাদেশ গঠন করে এবং পরিকল্পনা করে কীভাবে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলা চালানো যায়। একই বছর জানুয়ারিতে ইয়েমেন বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক উগ্রপন্থী ওয়াহাবী ইসলামের তাত্ত্বিকগুরু আনোয়ার আল-আওলাকির মতাদর্শ অনুসরণের দায়ে সিঙ্গাপুর সরকার ২৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। সিঙ্গাপুরের পুলিশ সন্দেহ করে উক্ত বাংলাদেশী নাগরিকরা আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের উগ্র মতবাদের অনুসারী।

অবাক করা ব্যাপার হলো, সিঙ্গাপুর থেকে বহিষ্কৃত বাংলাদেশি নাগরিকরা বিশ্বের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জিহাদি জঙ্গীগোষ্ঠি আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট উভয়কেই সমর্থন করে এবং তাদের মাঝে কোন বিভেদের দেয়াল নেই। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে এই দুই জিহাদি সংগঠনের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক। পরিশেষে বাংলাদেশের প্রায় সব ইসলামিক জিহাদি জঙ্গীদলগুলো আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট উভয়কেই তাদের আদর্শিক অবস্থান থেকে সমর্থন জানায় কারণ উভয়েই মুসলিম উম্মাহর জন্য কাজ করছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সাবেক সদস্য এবং আত্মস্বীকৃত ইসলামিক স্টেটের জঙ্গী আবদুল্লাহ গালিব ২০১৫ সালের মে মাসে গ্রেফতার হয়। সন্দেহ করা হয় আবদুল্লাহ গালিব জুন্দ আত-তাওহীদ-ওয়াল-খলিফা (জেটিকে) এবং ইসলামিক স্টেটের পক্ষে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করে। গ্রেফতার হওয়ার সময় তার বাসা থেকে আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের জিহাদি বই পাওয়া যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here