ধর্মালয় নয়, প্রয়োজন মানবালয়…

0
66
Bangladeshi Madrasa students are studying in a Madrasa at Dhaka in Bangladesh on January 16, 2018. Bangladesh is a country of 85% Muslims and Islam is still the most practiced religion here. There are lots of Madrasa (where Islamic teaching is imparted) across the country and millions of students are studying in these Madrasas. (Photo by Mehedi Hasan/NurPhoto via Getty Images)

মোস্তাফিজুল আবেদীন

ধর্মান্ধ বলেই মানুষ মানবতার চেয়ে ধর্মকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য এবং মানবতাকে ধর্মের নিয়মে বেঁধে রেখেছে। কারণ ধর্মকে বড় করে দেখার অর্থই মানবতাকে ছোট করা। মানবতাকে ছোট করা মানেই, মনুষ্যত্বকে বলি দেয়া। মানুষ যেমনিভাবে প্রতিদিন চিরঅভ্যস্ত ও প্রথামত ঈশ্বরকে ডাকে, তেমনি রাগ, হিংসা, লোভ করে; মোহে পড়ে, ঘুষ-দুর্নীতি, মিথ্যাচার করে…। অথচ ধর্মকর্ম তথা বিধিব্যবস্থার তিলমাত্র ত্রুটি করে না এবং যতোই যুক্তিপূর্ণ হোক, ধর্মের বিপক্ষে যায় এমন কিছু সহ্য করে না! এসব কী আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়তই দেখছি না? নাকি মানুষ লাগমহীন দুর্নীতি করুক, মিথ্যা বলুক, ঠকবাজ হোক… ক্ষতি নেই, ধর্ম পালন করলেই হলো, অর্থাৎ এতেই ধর্মের সন্তুষ্টি? সুতরাং একই সাথে ধার্মিকতা ও দুর্নীতির মহামারী দেখে মনে হয়- মানব জীবনে ধর্মের প্রয়োজন শুধু ধার্মিক হবার জন্য; মানুষ হবার জন্য নয়। কেননা, মানুষ হওয়ার জন্য মনের পবিত্রতা ও দৃঢ়তাই যথেষ্ট। না হলে, প্রায় শতভাগ ধার্মিকের এই দেশ হতো- পৃথিবীর স্বর্গ!

সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, লোভ ও লাভের মহড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে ধর্মের ঢাক পিটানো দেখে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক, সৎ হওয়ার জন্য নয়; নিষ্ঠুর ঈশ্বর ভীতির কারণেই মানুষ ধর্মকর্ম করে। ধর্ম যদি গুণা/পাপের তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা রাখতো এবং কার্যকরি ও চাক্ষুস প্রয়োগ থাকতো, তাহলে এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতাম না, বরং খুশি হতাম। কিন্তু এতো নৈতিকহীনতা সত্ত্বেও, ধর্ম স্বমহিমায় টিকেই শুধু নয়, বরং দিনদিনই আরো হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে। তাই মনে হয়, মানবজাতির দুর্ভোগ কোনোদিনও যাবে না বরং বাড়বে।

পূর্বেও বলেছি, ধর্মই একমাত্র বিষয়, যা সঠিকভাবে না পড়ে, না বুঝে… খাঁটি(!) ধার্মিক হওয়া ও থাকা সম্ভব। ফলে ধার্মিকের চিত্ত যে অতিসংকীর্ণ বেড়া দিয়ে ঘেরা থাকে, যা জানতে/বুঝতে পারেন না। সঠিকভাবে না জানাটা অন্যায় নয়, তবে জানার চেষ্টা না করা অবশ্যই অন্যায়। সুতরাং ধর্মকে সঠিকভাবে জানা সমস্ত মানবজাতির জন্য অত্যন্ত জরুরি ও মঙ্গলজনক। অথচ ধর্ম মস্তবড় উপকারী, এ ছাড়া মানবজাতির উপায় নেই… সর্বক্ষণ এবং জোরালোভাবে চারিদিক থেকেই শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ধর্মের গুণগান একমুহূর্তের জন্য থামালেই মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে! ফলে ধর্মের নেশায় নেশাগ্রস্ত ও বিভোর মানুষগুলো একে অত্যন্ত উদার ও অত্যাবশ্যকীয় বলে প্রচার করছে। এসব মিথ্যা প্রচার একেবারে নির্মূল করতে না পারলে, সত্যের মৃত্যু ঘটতেই থাকবে।

ধর্মই মানবজাতির রক্ষক ও উন্নতির সোপান হলে ধর্মহীন ব্যক্তি ও জাতির কেনো এতো উন্নতি হচ্ছে? ধার্মিক ব্যক্তি ও জাতিগুলোরই বা এতো অবনতি কেনো? সন্দেহ নেই কথিত ধর্মে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ, মহান… এ অহংবোধর মধ্যে কী হীনতা, শঠতা নেই? কারণ ধর্মের কী ক্ষতি হচ্ছে, কে করেছে, কেনো করেছে… এসব বিষয়ে সদাসতর্ক কিন্তু মনের দুর্দশার প্রতি কোনো খেয়াল নেই। ভেবে দেখি না, বিধর্মী বা ধর্মহীন জাতির মধ্যে এমন কী গুণ আছে, যার ফলে সেখানে প্রায় সব মহান বিজ্ঞানী, মাহান দার্শনিক জন্মাচ্ছে… অথচ ধার্মিক জাতিগুলোর মধ্যে উল্লেখ করার মতো মানুষ জন্মাচ্ছে না কেনো? কী এমন গুরুতর দোষ-ত্রুটির কারণে ধর্মরাষ্ট্রগুলোতে বেশিরভাগই স্বার্থপর, মিথ্যাবাদি, অহংকারী, লোভী, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, লুটেরা, ধর্মদানব… সৃষ্টি/জন্ম নিচ্ছে? এসব ভেবে দেখলে ও পরিবর্তনের চেষ্টা করলে জাতি উপকৃত হবে। তাছাড়া আমার ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ, অন্যেরটা মন্দ, বারবার, যখন-তখন এরূপ মিথ্যাচারে কোনো সুফল আনতে পারে না। যা প্রমাণিত সত্য।

সবচেয়ে অবাক ও ভয়ানক, এসব কেউ বোঝাতে চাইলেও ধার্মিকরা বুঝতে চায় না। ভয়ানক এজন্যই, যদি কেউ শিশুকালে ধর্মশিক্ষায় সন্ত্রাসী হওয়ার মন্ত্র পেয়ে থাকে, তাহলে তাকে দিয়ে যেকোনো নৃশংস্য হত্যাকাণ্ড/খারাপ কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব। কেননা ধর্মের বিভ্রান্তিকর শিক্ষার কারণেই- কারো চিত্ত বিকৃত, কারোটা জটিল, কারোটা অত্যন্ত জটিল; অনেকের সহজ-সরল হলেও, যতোটা হওয়ার কথা, ধর্ম কাউকেই ততোটা হতে দেয় না। কারণ হৃদয়কে সংকীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ রাখাই ধর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য। গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে না যাওয়ার জন্য দিবারাত্র সতর্ক ও ভয়ানক ভীতি প্রদর্শন আমৃত্যুই চলতে থাকে। অর্থাৎ ধর্ম মানব চিত্তের স্বাধীনতা দেওয়ার মতো উদার নয়। সেজন্যই ধর্মে-ধর্মে এমনকি একই ধর্মের মধ্যেও এতো মতপার্থক্য এবং বনিবনা হয় না। হতেই পারে না। কেননা যে শিক্ষা/অভ্যাস পড়ে-জেন-বুঝে নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া; যার আদর্শ/লক্ষ্য/উদ্দেশ্য মাপার/বোঝার… পূর্বে নিজের অজান্তেই গড়ে ওঠেছে, যে শিক্ষার মধ্যে ভালোর চেয়ে মন্দ মোটেও কম নয় বরং বেশি (কুসংস্কার, কুপ্রথা, ঘৃণা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা-পরনিন্দা, গরিমা, হুমকি, লোভ, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার, বাড়াবাড়ি… ইত্যাদি)। অর্থাৎ যে অভ্যাস বাইরে থেকে চাপানো, চিত্ত তা গ্রহণ করে কেবল মঙ্গলজনক কাজে ব্যবহার করবে, না চাইলেও ভুল পথে পরিচালিত করবে না, কিংবা পরিচালিত করার মানসিকতায় প্রস্থত রাখবে না, এর গ্যারান্টি কোথায়?
কারণ সংশয়ের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হলে সুশিক্ষা সম্ভব না। যে ছাত্রটি বেশি প্রশ্ন করে, তার শিক্ষা আর প্রশ্নহীন ছাত্রটির শিক্ষার মান এক নয়। পৃথিবীর প্রায় সব বিষয়কেই প্রশ্নের সম্মুখীন এবং সত্য-মিথ্যার প্রমাণ দিতে হলেও, ধর্মশিক্ষায় যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ। একমাত্র ধর্মের ব্যাপারে এহেন একচোখা নিয়ম, আইন, আচরণ তথা প্রশ্নহীন বিশ্বাসই মানবজাতির সবচেয়ে বড় বোকামি। অথচ এরূপ বোকামিকে মহৎ বলতে ও ভাবতে মানুষের দ্বিধা নেই বরং গর্ব আছে। ভাবখানা এমন- ধর্মে স্বোচ্ছাচারিতা বা ভুলভ্রান্তি আছে থাক না। খোঁজ-খবর বা পড়াশেনার দরকার কী? হোক না এ নিয়ে- বিতর্ক, হিংসা-বিদ্বেষ, অংহকার, লুটপাট, ধর্ষণ, পাশবিকতা, বিকৃত রুচির ও ভয়ংকরতম হত্যাযজ্ঞসহ নানা প্রলোভন, ভয়ভীতি, রক্তাক্ত যুদ্ধ-দাঙ্গা… (যেন এসব ধর্মের অঙ্গ)। দুঃখের বিষয়, এরূপ চিরবিবাদের পরেও তা আন্তর্জাকিতভাবে স্বীকৃত এবং কিচ্ছুটি বলা চলবে না; মহাকাশে তুলে রাখতেই হবে। বুঝলাম, কারো বিশ্বাসে হাত দেয়া উচিত নয়, কিন্তু যখন তা অবিরতভাবে মানবতায় আঘাত করে (শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও), একটি পবিত্র শিশুকে অপবিত্র তথা অহংকারী করে তোলে, ঘৃণা কিংবা নিজেকে শ্রেষ্ঠ এবং বিধর্মীদের খারাপ বা ছোট ভাবতে শেখায়… তথাপিও চুপ থাকতে হবে! এ কেমন আইন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here