আফ্রিকার সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন বোকো হারামের ইতিহাস

0
83

মোস্তাফিজুল আবেদীন

২০০৯ সালের দাঙ্গার পরে বোকো হারাম ভীষণরকম হিংস্র হয়ে ওঠে। বোকো হারামের নতুন নেতা আবুবাকার শেকাও ছিল প্রচণ্ড মৌলবাদী এবং সে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন কলাকৌশল প্রয়োগ করে এবং বোকো হারামের মৌলবাদী চিন্তাভাবনা আল-কায়েদার মত আন্তর্জাতিক জিহাদি দলের সাথে সংযুক্ত করে এবং যোগাযোগ স্থাপন করে। তাদের বিচার বিবেচনাহীন জঙ্গী আক্রমণের একটা উদাহরণ হতে পারে এরকম, নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলের যেসব স্থানে বোকো হারাম শক্তিশালী সেখানে মোটরগাড়ির ড্রাইভারদের আতংকিত করার জন্য যন্ত্রচালিত করাত দিয়ে ট্রাক ড্রাইভারদেরকে জবাই করতে শুর করে আইসিস স্টাইলে। নাইজেরিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বস নামানোর উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখেই বোকো হারাম পরিকল্পিতভাবে ট্রাক ড্রাইভারদের হত্যা করে যাতে তারা ট্রাক চালিয়ে মালামাল আনা নেয়া করতে না পারে।

ঘটনার পর পরই নাইজেরিয়ার নিরাপত্তাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোহাম্মদ ইউসুফকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালে নিরাপত্তাবাহিনী তাকে বিদ্রুপ করে বলে, যে পশ্চিমা শিক্ষা, বিজ্ঞানের বিষোদ্গার করেন, সেই পশ্চিমাদের আবিষ্কৃত কম্পিউটার কেন ব্যবহার করেন? জিজ্ঞাসাবাদের পরে কোন বিচার ছাড়াই হত্যা করে এবং সরকার এটাকে ‘বন্দুক যুদ্ধ’ বলে প্রচার করে। পাঁচ দিনব্যাপী সংঘর্ষে বোকো হারাম পুলিশ স্টেশন আক্রমণ করে এবং সেনাবাহিনী প্রতিরোধে নামার আগ পর্যন্ত পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধ চালিয়ে যায়। সেনাবাহিনীর কাছে ইউসুফ ধরা পড়ে এবং সেনাবাহিনী তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। পুলিশ দাবী করে ইউসুফ পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায় তাকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার মৃতদেহ দেখানো হয় এবং নিরাপত্তাবাহিনী ঘোষণা দেয় বোকো হারাম অধ্যায়ের এখানেই সমাপ্তি। কিছুদিন পরে একটা ভিডিও প্রকাশিত হয় যেখানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে বোকো হারাম সদস্য সন্দেহে মানুষদের মাঠের মধ্যে শুয়ে পড়তে বলা হয় এবং এরপর সেনাবাহিনী তাদের উপর গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে প্রায় ৮০০ মানুষ নিহত হয়। ২০০৯ সালে ইউসুফের মৃত্যুর পর তার সহযোগী আবুবাকার শেকাও গোপনস্থানের অজ্ঞাতবাস থেকে ভিডিও প্রকাশ করে নিজেকে বোকো হারামের নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং শক্তি সঞ্চয় করে ২০১০ সালে বোকো হারামকে পুনরায় সংগঠিত করে। তখন তারা আততায়ী হিসেবে অতর্কিত হামলা শুরু করে এবং জেলখানায় হামলা করে। বোকো হারাম ক্রমেই আধুনিক বিস্ফোরক এবং অস্ত্র নিয়ে মরণঘাতী আক্রমণ শুরু করে। ২০১১ সালে আগস্টে বোকো হারামের একজন আত্মঘাতী সদস্য নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায় গাড়ি ভর্তি বিস্ফোরক নিয়ে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালায়। সেখানে ২৩ জনের মৃত্যু হয় যাদের বেশিরভাগই দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নাইজেরিয়ার উত্তর এবং মধ্যাঞ্চলে এরকম জঙ্গী হামলার ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটতে থাকে। বোকো হারামের আক্রমণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মোটরবাইকে করে একজন বন্দুকধারী অতর্কিতে এসে গুলি করে চলে যায়। ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এরকম হামলা নিয়মিত ঘটনা। আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বিস্তৃত এবং সপ্তাহে কয়েকবার চলতে লাগল। বোকো হারাম রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা, নিরাপত্তাকর্মী এবং বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে লাগল।

জঙ্গী হামলা পরিচালনার এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্য অর্থের যোগান নিশ্চিত করতে বোকো হারাম ব্যাংক ডাকাতি শুরু করে। অর্থের উৎস বের করতে তারা নাইজেরিয়ার উপকূলে যাতায়াত করা জাহাজে দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে ছিনিয়ে নিতে লাগল টাকা-পয়সা আর সেই সাথে চলতে লাগল মাদক চোরাচালানের কারবার। গত বছর বোকো হারাম পূর্ণাঙ্গ পদাতিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ, ট্যাংক কিনতে সক্ষম হয়। এবার তারা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে, পুলিশ ফাঁড়ি ও থানাতে। বোকো হারাম জঙ্গী দলের আগমন ঘটলেই অনেক সময় নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী, পুলিশ নিরাপত্তা, তল্লাশি চৌকি ফেলে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যেত। বোকো হারামের আক্রমণও করা লাগত না। নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি যখন ঘোষণা দেন বোকো হারাম সদস্যরা যদি অস্ত্র ত্যাগ করে তবে তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা করে দেয়া হবে তখন বোকো হারামের নেতা রাষ্ট্রপতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়ে উলটো সরকারকেই বোকো হারামের কাছে আত্মসমর্পণ করার হুমকি দেয়। এমনকি বোকো হারাম সরকারকেও ক্ষমা করার হাস্যকর প্রস্তাব দেয়।

যেহেতু বোকো হারাম ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে উঠছে সেহেতু এটা পরিষ্কার যে নাইজেরিয়ান সরকার বোকা হারামের বিদ্রোহ আর অতর্কিত আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবে না। পশ্চিমা গণমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই এসব খবর প্রকাশ পায় এবং পাঠকের মনে এমন নির্বিকার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেন জঙ্গী হামলায় মৃতের ঘটনা ভূমিকম্প বা যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতই স্বাভাবিক। কিন্তু বোকো হারাম নিয়মিত জঙ্গী হামলা চালিয়েই যাচ্ছে নিরাপত্তাবাহিনীর নাকের ডগায়। বোকো হারামের প্রত্যক্ষ তৎপরতার কারণেই দেশটিতে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে। আজকের এই বিষবৃক্ষের বীজ প্রোথিত হয়েছিল কয়েক দশক আগে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বোকো হারাম প্রায় ৩০০ স্কুল বালিকাকে অপহরণ করেছে। বিগত বছরগুলোতে মধ্যেবোকো হারাম আল-কায়েদার কাছ থেকে হাতে কলমে শিখে নেয় সন্ত্রাসী হামলায় কীভাবে বিস্ফোরক ব্যবহার করে একসাথে অনেক মানুষকে হত্যা করা যায়। আল-কায়েদার সাথে বোকো হারামের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের কারণে নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকা অঞ্চলে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এই চিন্তায় যে বোকো হারাম হয়ত নাইজেরিয়ার বাইরে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে দেবে। ধারণা করা হচ্ছে বর্তমানে তারা ইরাক এবং সিরিয়ার আইসিসের সাথে যোগসুত্র স্থাপন করেছে। প্রথমে আল-কায়েদা এবং পরে আইসিসের মত জিহাদি সংগঠনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পরে বোকো হারাম নিজেই আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে যেমন নাইজেরিয়ার বাইরে চাদ, নাইজার এবং ক্যামেরুনের উত্তরাঞ্চলে বোকো হারামের কার্যক্রম বিদ্যমান আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here