আপনার সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাবেন না

0
56

মোস্তাফিজুল আবেদীন

গ্রাম থেকে শহরে গেলাম। বড় চাচার তত্বাবধানে সেখানকার লিল্লাহ বোর্ডিং হাফিজি মাদ্রাসায় ভর্তি হলাম।

বাবার বড়ভাই আমার স্থানীয় অভিভাবক। মাদ্রাসায় প্রায় আশিজন ছাত্র ছিলাম। এতজন ছাত্রের মাঝে কিছুটা আলাদা কদর পেলাম, চাচা সেই মাদ্রাসা কমিটির সদস্য হওয়ায়।

সমস্যাটা এখানেই। অন্যসব ছাত্রদের বাবা-মা এসে হুজুরকে বলে যায়, আমার ছেলেটাকে দেখে রাখবেন। মারধর করবেন না। এদিকে আমার চাচা হুজুরকে গিয়ে বলে- “আপনার হাতে ছেড়ে দিলাম, পিটিয়ে সোজা করবেন”।

ব্যাস। হয়ে গেল। মাদ্রাসার মসজিদের পাশে অথবা সামনে একটি রাবার গাছ ছিল, যার বেত খুব শক্ত। মচকাবে, তবু ভাঙবে না টাইপ। সেই বেতের বাড়ী চলতে থাকলো আমার উপর।

ছাত্র হিসেবে ভালো ছিলাম। পড়া মুখস্থ করতে সমস্যা হতো না। আর ছোট হুজুরের কাছে পড়া দিতাম না। বলাবাহুল্য, প্রথমে যে হুজুর ছিল অর্থাৎ যাকে গিয়ে চাচা আমাকে পিটিয়ে সোজা করতে বলেছিলেন; তিনি বয়সের কারণে পরবর্তীতে ছোট হুজুর হয়েছিলেন। বড় হুজুর আসেন চুয়াডাঙ্গা থেকে। আমি বড় হুজুরের কাছে ভোরের ছবক (প্রাত্যহিক মুখস্থ) সাত ছবক (সাপ্তাহিক মুখস্থ রিপিট) এবং পাড়া (বিগত সব পাড়া) শুনাতাম। বড় হুজুরগুলো বয়সের কারণে ছোট হুজুরদের থেকে কিছুটা মানবিক হয়ে থাকে। আমি ঠিক এ কারণে বড় হুজুরের মার খেয়েছি কম। কিংবা হয়তো উনি মারেননি।

ছোট হুজুরের দায়িত্বজ্ঞান বেশি ছিল। ভোরের ঘণ্টা দেয়ার পাঁচ মিনিট পর ক্লাসে উপস্থিত হতে হতো। এবং আমি আর একটু ঘুমাই বলে প্রায়ই ভোরের ক্লাসে সময়মত উপস্থিত হতে পারতাম না। এ কারণে প্রচুর মার খেয়েছি।

মাদ্রাসার শাস্তি ছিল তিনরকম। কান ধরে উঠাবসা করা, মুরগী হয়ে (দু পায়ে ভর দিয়ে পায়ের নিচ দিয়ে দু’হাতে দু’কান ধরে থাকা) থাকা এবং মার খাওয়া।

বেশি ঘুমানোর কারণে, বাহিরের বই (কাজী আনোয়ার হোসেন, মাসুদ রানা, রকিব হাসান পড়তাম) পড়ার কারণে এবং নামাজ পড়তে ফাকিবাজি করার কারণে সবথেকে বেশি শাস্তি পেয়েছি।

একদিন জোহরের নামাযে সিজদায় গিয়ে ঘুমানোর কারণে নামাযের পর থেকে আসরের নামাজের মধ্যেকার সময়ে দু’দু’শ বার কান ধরে উঠাবসা করেছি৷ যার ফলে কয়েকদিন পা’য়ের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। প্রচণ্ড ব্যথা আর কষ্টের সময়গুলোতে মা’র মুখ কল্পনা করতাম। শুধু মা’র কাছে যেতে ইচ্ছে হতো। টয়লেটে, নামাজে সেজদায় গিয়ে এবং রাতে কাথায় মুখ ডুবিয়ে কান্না করতাম।

একসময় মা-বাবার প্রতি একটা ক্রোধ জন্মালো। গ্রামের মাদ্রাসায় প্রতিমাসে বাড়ীতে গিয়ে সারামাসের পিটুনির ব্যাথা ভুলে যেতাম। শহরের মাদ্রাসায় পিটন খাই আর কান্না করি।
একসময় মা-বাবা এবং চাচার প্রতি ভীষণ অভিমান জন্মালো। যারফলে
পরবর্তীতে মুরগী হবার শাস্তি দিলেও আমি বেতের মার অপশন বেছে নিয়েছিলাম। খুব জেদি ছিলাম। হুজুর মারলে হাত দিয়ে আটকাতাম না। তাতে অবশ্য আরো বেশি মারতো। আমি দাতে দাত চেপে থাকতাম। প্রচণ্ড কল্পনাবিলাসী ছিলাম। পিটন খাবার সময় চোখ বন্ধ করে মা, বাড়ীর সামনের পুকুর, পেপে গাছ, ইউকিলিপ্টাসের আগায় বাবুই পাখির বাসা এসব ভাবতাম।

কোথাও এক মাদ্রাসাছাত্রকে মেরে চোখ নষ্ট করে দিয়েছে মাদ্রাসাশিক্ষক। সারা বাংলাদেশে ব্যাঙেরছাতার মতো গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোর প্রত্যেকটিরই এই এক চিত্র।
সর্বাঙ্গে ব্যাথা, ঔষধ দিব কোথা। ধর্মান্ধ মুসলিমরা এখনো মনে করে হুজুর যেখানে মারে, সেখানে সে অংশটি বেহেস্তে যায়। ব্যাস। মাইর খাওয়াও যায়েজ হলো। মারাও যায়েজ হলো।

ধর্মে মানুষ অন্ধ হয় নাকি ধর্ম মানুষদের অন্ধ করে এ প্রশ্ন করছি না। তবে পুজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধনী শোষকদের আরো ধনী এবং গরীবদের আরো গরীব বানানোর জন্য ধর্মের গুরুত্ব অপরিসীম!! আর এ কারণেই ধর্ম এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও টিকে আছে।

গরীব মানুষের সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে পিতা-মাতা অভিভাবকরা আশায় থাকেন; তাদের সন্তানেরা অন্তত একজন গোলাম আযম, তোফাজ্জল, সাঈদি নেহায়েত মসজিদের মুয়াজ্জিন হয়ে টাকা কামাবে এই ভেবে মা-বাবারা নিজেরা অভাবে দিন পার করলেও নিতান্ত অপারগ হয়ে সন্তানদের মাদ্রাসা-এতিমখানায় পাঠায়। আর স্থুলবুদ্ধির হুজুরেরা সেসব শিশুদের শুধুমাত্র পিটুনি দেয়ার বস্ত হিসেবে ব্যবহার করে।।

আমি মাদ্রাসাছাত্রের চোখ নষ্টের বিচার চাইবো না। কারণ পুজিপতি আইন, বিচার কিংবা বিচারকরাই অন্ধ। হয়তো আর্থিকভাবে অন্ধ নয়তো ধর্মান্ধ।

আমি মাদ্রাসা নামক অশিক্ষাব্যাবস্থার নির্মূল চাই। এই শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করা হোক।

আপনার সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here